এমন বাস্তবতায় আগামী সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের উদ্বেগ ও অবস্থান তুলে ধরবে বিএনপি।
জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িসহ সারা দেশে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের ছয় মাস পরে এসে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো গণতান্ত্রিক দল এসব কর্মকাণ্ড সমর্থন করতে পারে না।
বৈঠকে বিএনপি নেতারা মত প্রকাশ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের এত দিন পর দেশজুড়ে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে টার্গেট হচ্ছে বিএনপি ও নির্বাচন। একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে ছাত্ররা তাদের শক্তি প্রদর্শন করছে। উদ্দেশ্য, নির্বাচন প্রলম্বিত করা, যাতে দ্রুত সময়ে রোডম্যাপ ঘোষণা না করা হয়। কারণ ছাত্ররা নতুন দল গঠন করে সারা দেশে সংগঠনকে সুসংহত করতে যথেষ্ট সময় চায়। অন্যদিকে বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। নির্বাচন দিতে দেশি-বিদেশি চাপও বাড়ছে। এমন অবস্থায় নির্বাচন বিলম্বিত করতে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে মনে করে বিএনপি।
বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির এক নেতা বলেন, একটি দেশে বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান হওয়ার পরপরই নানা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এত দিন পরে এসে কেন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটবে। এ ধরনের ঘটনা তো মাসের পর মাস চলতে পারে না। দেশ কি স্থিতিশীল হবে না?
জানা গেছে, বৈঠকে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় সমাবেশ ও জেলায় জেলায় সমাবেশ। এই ইস্যুতে রমজানের আগেই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। মূলত নির্বাচনের দাবিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি।
বিএনপি মনে করে, চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের যে লক্ষ্য সেটি পূরণ হবে না। ন্যূনতম সংস্কার করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই এই সরকারের লক্ষ্য; গত এক দশক ধরে যে ধরনের নির্বাচন বাংলাদেশ হয়নি। কারণ শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে দেশে ২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে মানুষ ভোট দিতে পারেনি কিংবা দেয়নি।
পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন : বিএনপি
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি বলেছে, এর ব্যত্যয় হলে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির প্রসার ঘটবে। দলটি আরো বলেছে, কঠোরভাবে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান করা এখন সময়ের দাবি।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় বিএনপি।
বিএনপির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার এবং তার দোসরদের উসকানিমূলক আচরণ, জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে অশালীন এবং আপত্তিকর বক্তব্য-মন্তব্য দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ক্রোধের জন্ম দিয়েছে। এরই ফলে গত বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত স্বৈরাচারের স্মৃতি, মূর্তি, স্থাপনা ও নামফলকগুলো ভেঙে ফেলার মতো জনস্পৃহা দৃশ্যমান হয়েছে। বিএনপির উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা প্রকাশ করতে না পারলে রাষ্ট্র ও সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে উগ্র নৈরাজ্যবাদী গণতন্ত্রবিরোধী দেশি-বিদেশি অপশক্তির পাশাপাশি পরাজিত ফ্যাসিস্টদের পুনরুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে, যার উপসর্গ এরই মধ্যে দৃশ্যমান।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ছয় মাসেও পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ জনসমক্ষে দৃশ্যমান করতে সফল হয়নি বলে জনমনে প্রতিভাত হয়েছে। ফলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হচ্ছে। একটি সরকার বহাল থাকা অবস্থায় জনগণ এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিলে দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জনগণের প্রত্যাশা ছিল দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, যা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা ধরনের দাবিদাওয়া নিয়ে যখন-তখন সড়কে ‘মব কালচারের’ মাধ্যমে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে, যে ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে মুনশিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
দলটির বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, নিন্দিত-ঘৃণিত পলাতক স্বৈরাচার ও তার দোসরদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরাজিত ফ্যাসিস্টদের উসকানিমূলক তৎপরতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরি; অথচ এসব বিষয়ে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে মানুষের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকারসহ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত শিগগির সম্ভব একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।