যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা জোরালো হয়েছে। অনেকের মতে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। চুক্তিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে বাংলাদেশের জন্য যতটা না ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তারচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে চুক্তির ঘোষণাটি আসে। এরপর চুক্তিটি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই চুক্তিতে শুল্ক হ্রাস, অশুল্ক বাধা অপসারণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আজ পড়ুন দ্বিতীয় অংশ:
অনুচ্ছেদ ২.৩: কৃষি
১. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বৈষম্যহীন বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার দেবে, যা পরিশিষ্ট-১-এর প্রথম ভাগে নির্ধারিত আছে।
২. বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে যে, তার স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ব্যবস্থা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক এবং তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর গোপন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে না এবং পারস্পরিকতাকে ক্ষুণ্ন করে—এমন ক্ষেত্রে অযৌক্তিক এসপিএস প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করবে।
৩. বাংলাদেশ তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যাবে না, যেখানে অবৈজ্ঞানিক, বৈষম্যমূলক বা অগ্রাধিকারমূলক কারিগরি মান অন্তর্ভুক্ত থাকে; তৃতীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এসপিএস ব্যবস্থা থাকে; অথবা অন্য কোনোভাবে তৃতীয় দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকে অসুবিধার মধ্যে ফেলে।
অনুচ্ছেদ ২.৪: ভৌগোলিক নির্দেশক
বাংলাদেশ ভৌগোলিক নির্দেশকের সুরক্ষা বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে। এই প্রচেষ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক চুক্তিও থাকবে। এমন ক্ষেত্রে, যেখানে বাংলাদেশ কোনো পণ্যকে ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে সুরক্ষা বা স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু পণ্যের এমন কোনো নির্দিষ্ট গুণমান, সুনাম বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নেই, যা মূলত তার ভৌগোলিক উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা নেবে।
অনুচ্ছেদ ২.৫: পনির ও মাংস-সম্পর্কিত পরিভাষা
বাংলাদেশ পরিশিষ্ট-২-এ তালিকাভুক্ত পনির ও মাংস-সম্পর্কিত পরিভাষার কেবল পৃথক ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করবে না।
অনুচ্ছেদ ২.৬: মেধাস্বত্ব
বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা মান নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব অধিকারের দেওয়ানি, ফৌজদারিসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে এবং নিশ্চিত করবে যে, এই ব্যবস্থাগুলো মেধাস্বত্বের লঙ্ঘন বা অপব্যবহার প্রতিরোধ ও নিরুৎসাহিত করে, যার মধ্যে অনলাইন মাধ্যমও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ফৌজদারি এবং সীমান্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেবে এবং পদক্ষেপ নেবে।
অনুচ্ছেদ ২.৭: সেবা
বাংলাদেশ এমন কোনো ব্যবস্থা নেবে না বা বজায় রাখবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের সেবা বা সেবা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সব বাণিজ্য চুক্তিতে কোনো ব্যবস্থা প্রাসঙ্গিক অ-অনুবর্তী ব্যবস্থা বা সীমাবদ্ধতার আওতাভুক্ত অথবা সেই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাধ্য নয়, এমন ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না।
অনুচ্ছেদ ২.৮: উত্তম নিয়ন্ত্রক চর্চা
বাংলাদেশ পরিশিষ্ট-৩-এর অনুচ্ছেদ ১.১৭-এ বর্ণিত উত্তম নিয়ন্ত্রক চর্চা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে, যা নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার পুরো জীবনচক্রে অধিক স্বচ্ছতা, পূর্বানুমান যোগ্যতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
অনুচ্ছেদ ২.৯: শ্রম
১. বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে দণ্ডিত শ্রম বা জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক শ্রম—যার মধ্যে চুক্তিবদ্ধ শ্রম ও চুক্তিবদ্ধ শিশুশ্রম অন্তর্ভুক্ত—দ্বারা খনন, উৎপাদন বা প্রস্তুত করা পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও তা বাস্তবায়ন করবে।
২. বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকারসমূহ রক্ষা করবে। এর মধ্যে আইন ও প্রয়োগে এই অধিকারসমূহ গ্রহণ বা বজায় রাখা এবং কার্যকরভাবে শ্রম আইন প্রয়োগ করা, যার মধ্যে শ্রম অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি বা বজায় রাখা অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ এসব আইনের লঙ্ঘনের জন্য উপযুক্ত আইনি শাস্তি নির্ধারণ ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করবে। বাংলাদেশ তার শ্রম আইনে সুরক্ষার মান দুর্বল বা হ্রাস করবে না এবং বাণিজ্য বা বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য এ পর্যন্ত যেকোনো ধরনের দুর্বলতা বা হ্রাস করা হয়ে থাকলে তা সমাধান করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম অধিকার-সম্পর্কিত এমন বিষয়গুলো সমাধান করবে, যা অসম বাণিজ্যে ভূমিকা রাখে।
অনুচ্ছেদ ২.১০: পরিবেশ
বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা গ্রহণ ও বজায় রাখবে, তার পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করবে, প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিশালী পরিবেশগত শাসনকাঠামো বজায় রাখবে বা প্রতিষ্ঠা করবে এবং পরিবেশ-সম্পর্কিত এমন বিষয়সমূহ সমাধান করবে, যা অসমপর্যায়ের বাণিজ্যে অবদান রাখে।
অনুচ্ছেদ ২.১১: সীমান্তব্যবস্থা এবং কর
১. যদি যুক্তরাষ্ট্র আইনের ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে সুবিধা অর্জনের চেষ্টা মোকাবিলার জন্য এমন কোনো সীমান্তব্যবস্থা নেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ও ব্যবসার জন্য অসুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তাহলে বাংলাদেশ বিষয়টি সমাধানের জন্য তার সীমান্তব্যবস্থাগুলোকে সমন্বয় ও সামঞ্জস্যমূলক করার চেষ্টা করবে।
২. করব্যবস্থার পার্থক্য অসম বাণিজ্যে অবদান রাখতে পারে—এটি স্বীকার করে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত এমন কোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপত্তি করবে না, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কর ফেরত দেওয়া বা আরোপ না করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়; এর মধ্যে পরিপূরক ব্যবস্থা গ্রহণ বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) আপত্তি অন্তর্ভুক্ত।
৩. বাংলাদেশ আইনগতভাবে বা বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক মূল্য সংযোজন কর আরোপ করবে না।
৪. বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এমন প্রযুক্তিগত সমাধান বাস্তবায়ন ও বজায় রাখবে, যা তার সীমান্ত অতিক্রমকারী যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য সম্পূর্ণ আগমনের পূর্বপ্রক্রিয়া, কাগজবিহীন বাণিজ্য ও ডিজিটালাইজড প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে।







