আজ ২ মার্চ—আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু, চারণকবি–সাধক দিদারুল আলম রফিক স্যারের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি পরমের ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকগমন করেন। পরদিন ৩ মার্চ, সকালের স্নিগ্ধ আলোয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শোকর্যালি করে আমরা মগধরা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছিলাম। কত বছর পেরিয়ে গেছে তবু এই দিনটি এলেই হৃদয় অদৃশ্য এক বেদনায় ভরে ওঠে। স্মৃতিরা একে একে ফিরে আসে, আর আমি হারিয়ে যাই সেই দিনগুলোর মাঝে—যেখানে তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর স্নেহময় উপস্থিতি এখনো স্পষ্ট।
২০২৪ সালের ২ মার্চ তাঁর কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। মগধরা ইউনিয়নের জাহেদুর রহমান মুক্তার (প্রকাশ জাহেদ মুক্তার)–এর বাড়ির শানবাঁধানো পুকুরপাড়ের পূর্ব–দক্ষিণ কোণে, প্রকৃতির নিবিড় নীরবতায় তিনি শায়িত। পুকুরের স্বচ্ছ জলে রোদের ঝিলিক পড়ে, মেঘের ছায়া এসে থমকে দাঁড়ায়। চারপাশে ফুল, ফল, পাখির কূজনে গ্রামবাংলার এক নির্মল, সুনিবিড় সৌন্দর্য। বসন্তের কোকিল ডেকে যায় দূর আকাশে। কোথাও পাতা ঝরার উৎসব, কোথাও আবার কচি পাতার সবুজ অভ্যুদয়, জীবনের অনিত্যতা আর নবজাগরণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
আঙিনায় শুকনো পাতার স্তূপ দেখে মনে পড়ল তাঁর কণ্ঠে গাওয়া কাজী নজরুল ইসলাম এর গান—
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
নাচিছে ঘুর্ণিবায়
জল তরঙ্গে ঝিল্মিল্ ঝিল্মিল্
ঢেউ তুলে সে যায়।।
দীঘির বুকে শতদল দলি’
ঝরায়ে বকুল–চাঁপার কলি
চঞ্চল ঝরনার জল ছল ছলি
মাঠের পথে সে ধায়।।
দখিনা হাওয়ায় খসে পড়া পাতার শব্দে যেন সে সুর আবারও জেগে উঠল। স্যারের কণ্ঠে এই গান শুনে আমরা মুগ্ধ হতাম; তাঁর কণ্ঠে ছিল মাটি, মানুষ আর আকাশের এক অপার্থিব সংযোগ।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো—মানুষ কত একা, কত ক্ষণস্থায়ী! অথচ তাঁর সৃষ্টিরা আজও আমাদের হৃদয়ে জাগরূক। কবর জিয়ারতের পর দিঘির শান্ত জলে পা ভেজাতেই মনটা শীতল হয়ে এলো, অনুভূতি আরও গভীর হলো।
কবরের ঠিক পাশেই কামরাঙার ডালে থরথর করে ঝুলছে ফল। পাখিরা তৃপ্তির সাথে খাচ্ছে, গাছের নিচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ফল। সেই দৃশ্য দেখে মনে পড়ল তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত গান—
“কোথা চাঁদ আমার!
নিখিল ভুবন মোর ঘিরিল আঁধার॥
ওগো বন্ধু আমার, হ’তে কুসুম যদি,
রাখিতাম কেশে তুলি’ নিরবধি।
রাখিতাম বুকে চাপি’ হ’তে যদি হার॥
আমার উদয়-তারার শাড়ি ছিঁড়েছে কবে,
কামরাঙা শাঁখা আর হাতে কি রবে।
ফিরে এস, খোলা আজো দখিন-দুয়ার॥
বসন্তের এমন দুপুরে রোদের ঝিলিক গাছের পাতায় পাতায় আলোছায়ার নাচন তোলে। পুকুরের শান্ত জল বাতাসের মৃদু স্পর্শে কেঁপে ওঠে। চারদিকের নয়নাভিরাম সবুজ প্রান্তর যেন বেহেশতের উদ্যান। পুকুরপাড়ে পাতাবাহার, জলপাই, কাঁঠালের সারি সারি গাছ; দরজার দু’ধারে সুপারির সুবিন্যস্ত সমাহার। ফুল–ফলের মোহনীয় ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ।
এমন স্নিগ্ধ পরিবেশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। দখিনা বাতাস যেন সারাক্ষণ তাঁকে আলতো করে ছুঁয়ে যায়। ফুল ও ফলের প্রশস্ত উদ্যানে তিনি যেন নীরবতার গভীরে শান্ত ঘুমে নিমগ্ন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্ত আবাসে।
কবিও সাধক দিদারুল আলম রফিক তথা গায়ক রফিক স্যার একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা, একজন গবেষক ও আধ্যাত্মিক পুরুষ। তাঁর গানও কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রভাব সুস্পষ্ট। নজরুলপ্রেমী এই সুরসাধক জীবনভর সুন্দরের আর আধ্যাত্মিক চেতনার সাধনায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে অনির্বাণ সৌন্দর্যের ধ্বনি আজও প্রতিধ্বনিত হয়।
এই মহিরুহ শিক্ষকের স্নেহধন্য ছাত্র হতে পেরে আমি আজীবন গর্বিত। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও নীরব প্রার্থনা—
স্যার, আপনি শান্তিতে থাকুন। আপনার সুর, আপনার বাণী আমাদের হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকুক।
২ মার্চ ২০২৬
ঢাকা।







