উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলার জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

রোববার (১ মার্চ) রয়টার্স জানিয়েছে, করোনা মহামারির পর এটাই এই অঞ্চলজুড়ে সবচেয়ে বিস্তৃত ব্যবসায়িক বিঘ্নের ঘটনা। বিমানবন্দর বন্ধ, সমুদ্রবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত এবং শেয়ারবাজারে ধস—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা উপসাগরীয় অর্থনীতিতে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া।

ইরানের এই পাল্টা হামলা ছড়িয়ে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সবগুলো প্রধান রাষ্ট্রে। এই হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছেন। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশটির দুবাই ও আবুধাবিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিশেষ করে, দুবাইয়ের জন্য এই পরিস্থিতি নজিরবিহীন। একসময় ছোট্ট মৎস্য গ্রাম থেকে তেল বিক্রির আয়ে বন্দর, বিমানবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল শহরটিতে। পরে বিলাসবহুল পর্যটন, রিয়েল এস্টেট ও আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই শহরের যে আধুনিক পরিচয় গড়ে উঠেছে, তা এবার বড় ধরনের চাপে পড়েছে।

আরও পড়ুন:  আটলান্টিকে দুটি তেলবাহী জাহাজ আটক যুক্তরাষ্ট্রের

সেঞ্চুরি ফিন্যান্সিয়ালের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা বিজয় ভালেচা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—তেলের দাম বেড়ে গেলে সৌদি আরব ও কাতারের মতো উৎপাদক দেশগুলোর জন্য আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পর্যটন খাত বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে, নৌপরিবহনে ঝুঁকি বাড়লে।

রোববার লেনদেনের শুরুতেই উপসাগরীয় দেশগুলোর শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা যায়। সৌদি আরবের প্রধান সূচক দিনের শুরুতেই ৪ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত ২.২ শতাংশ কমে দিন শেষ হয় দেশটির। ওমানে সূচক কমেছে ১.৪ শতাংশ এবং মিশরে ২.৫ শতাংশ কমেছে। কুয়েতের শেয়ারবাজার সাময়িকভাবে লেনদেন স্থগিত করেছে।

ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা, বন্দর ও হোটেল লক্ষ্যবস্তু হয়। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে অন্তত একজন বেসামরিক নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। জাবেল আলি পোর্টের একটি জেটিতেও আগুন ধরে যায়।

আরও পড়ুন:  ফের সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান

রক্ষা পায়নি আবাসিক এলাকাও। দুবাই মেরিনা, পাম জুমেইরা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ‘ফেরামন্ট দ্য পাম’ হোটেলেও আগুন লাগে এবং প্রতীকী স্থাপনা বুর্জ আল আরব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি ৩২৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া ফেয়ারমন্টের ক্ষতি উপসাগরীয় আতিথেয়তা খাতের উত্থানের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রমজান মাসে করপোরেট ইফতার ও সাহরি উপসাগরীয় ব্যবসায়িক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এমিরেটস, মাসদার, মুবাদালা ও জিইএমএস এডুকেশন সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এই আয়োজন বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। দুবাই, আবুধাবি ও কাতারের দোহাসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট বিমানবন্দর আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। আমিরাতের শ্রম কর্তৃপক্ষ ৩ মার্চ পর্যন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বাসায় বসে কর্মপদ্ধতি চালুর পরামর্শ দিয়েছে।

আরও পড়ুন:  মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজার অস্থিরই থাকবে। আর রমজানের নেটওয়ার্কিং মৌসুম ভেস্তে যাওয়ায় যে অদৃশ্য ব্যবসায়িক ক্ষতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *