আবারও আকাশে ফিরছে ‘ব্লাড মুন’। আগামী ৩ মার্চ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ ধারণ করবে রক্ত-লাল আভা, যা বরাবরই আকাশপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। চাঁদের এই রঙ বদলের পেছনে রয়েছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও আলোর বিচ্ছুরণের এক অভিনব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
আর এটিই এই গ্রহণকে করে তুলেছে আরও বিশেষ কিছু। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদের কক্ষপথ ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিশেষ অবস্থানের কারণেই এবার এমন ব্যতিক্রমী দৃশ্যের সৃষ্টি হবে।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, আগামী ৩ মার্চ রাতের আকাশে ঘটবে বছরের প্রথম পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। এসময় চাঁদ ধারণ করবে গাঢ় লাল ও নীল রঙের মিশ্র আভা। আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যবেক্ষকরা এর মাধ্যমে এক বিরল দৃশ্য দেখবেন।
গ্রহণের সময় চাঁদ লাল হয় কেন?
পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান নেয় পৃথিবী। এতে সূর্যের সরাসরি আলো চাঁদে পৌঁছাতে পারে না। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বিশাল এক লেন্সের মতো কাজ করে সূর্যের আলোকে বাঁকিয়ে পৃথিবীর প্রান্ত ঘুরিয়ে চাঁদের দিকে পাঠায়।
এ প্রক্রিয়াকে রেলি স্ক্যাটারিং বলা হয়। আর এই কারণে দিনের আকাশ নীল আর সূর্যাস্ত লাল দেখায়। বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে আলো অতিক্রম করার সময় ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল ও বেগুনি আলো ছড়িয়ে যায়। দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল আলো তুলনামূলকভাবে অক্ষত থেকে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছে, ফলে চাঁদ রক্তিম আভা ধারণ করে। এ কারণেই একে ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়।
২০২৬ সালের গ্রহণ কেন আলাদা?
প্রতিটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে চাঁদ পৃথিবীর ঘন অন্ধকার ছায়া বা উমব্রায় প্রবেশ করে। তবে ২০২৬ সালের গ্রহণের এই ঘটনাটি বিশেষ, কারণ চাঁদ উমব্রার একেবারে ওপরের প্রান্ত ঘেঁষে অতিক্রম করবে।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, এ অবস্থায় চাঁদের ওপর পড়া আলো পৃথিবীর নিম্নস্তরের ধুলোময় বায়ুমণ্ডল দিয়ে নয়, বরং ওপরের স্তর, তথা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ভেতর দিয়ে যাবে। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞানী রিচার্ড কিন স্পেসওয়েদার ডটকমকে জানান, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওপর দিয়ে যাওয়া আলো সরাসরি ওজোন স্তর ভেদ করে আসে।
ফলে এবার চাঁদের অবস্থান এমন হবে যে নিম্নস্তরের গভীর লাল আভা পুরোপুরি প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। ফলে ওজোন দ্বারা ছেঁকে যাওয়া নীল আলো স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। সাধারণত এ ধরনের নীল আভা খুব ক্ষীণ হয়, খালি চোখে বোঝা যায় না। কিন্তু এবার তা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হতে পারে।
নেভি ব্লু বা গাঢ় নীল আভার রহস্য কী?
এবারের নীল আভার পেছনে রয়েছে ‘শ্যাপুই শোষণ ব্যান্ড’ নামে পরিচিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। ফরাসি রসায়নবিদ জেমস শ্যাপুইয়ের নামে নামকরণ করা এই প্রক্রিয়ায় ওজোন অণু হলুদ, কমলা ও লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে ফেলে।
নিম্নস্তরের বায়ুমণ্ডল যেখানে নীল আলো ছড়িয়ে দেয়, সেখানে ওজোন লাল আলো শোষণে অত্যন্ত কার্যকর। সূর্যের আলো যখন বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তর দিয়ে অতিক্রম করে, তখন ওজোন লাল অংশ ছেঁকে দেয় এবং নীল আভা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ফলে পৃথিবীর ছায়ার কিনারায় একটি টারকোয়েজ বা গাঢ় নীল রেখা তৈরি হয়। আগামী ৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ৩৩ মিনিটে গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে লাল ও অন্ধকার ছায়ার সংযোগস্থলে এই নীল ব্যান্ড দেখা যেতে পারে।
রঙ পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে?
গবেষকেরা উপগ্রহ তথ্য ও রে-ট্রেসিং মডেল ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, ওজোন স্তর না থাকলে চাঁদ শুধু লালই দেখাত। স্পেকট্রোস্কোপি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে দৃশ্যমান নীল আলো ওজোন অণুর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই মিলে যায়।
মূলত গ্রহণ ঘিরে প্রায় ৭২ ঘণ্টার একটি সময়কে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। এই সময়ে চাঁদকে আয়নার মতো ব্যবহার করে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের রাসায়নিক গঠন ও ওজোনের ঘনত্ব পরিমাপ করা হয়। এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য মাটিতে বসে সাধারণত সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
এই স্বল্প সময়ের জন্য চাঁদ শুধু একটি উপগ্রহ নয়, বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আলোকিত প্রতিবেদন হয়ে ওঠে, যেখানে আমাদের অদৃশ্য সুরক্ষাবলয় ওজোন স্তরের প্রভাব আকাশজুড়ে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।







